ভালোবাসার ত্রিশ বছর


মো: আব্দুল মুনিম জাহেদী ক্যারল : ভালোবাসা একটি মানবিক অনুভূতি এবং আবেগকেন্দ্রিক একটি অভিজ্ঞতা। আমাদের চারপাশে অনেক মানুষ থাকে। কিন্তু সবাই আমাদের প্রিয় মানুষ হয় না। যারা আমাদের মনের দুঃখ-কষ্ট বুঝতে পারে এবং সবসময় পাশে থাকে তারাই আমাদের প্রিয় মানুষ হয়ে থাকে। বিশেষ কোনো মানুষের জন্য মায়া, মোহ, আবেগ এবং অনুভূতির বহিঃপ্রকাশ হচ্ছে ভালোবাসা। তবুও ভালোবাসাকে বিভিন্ন দৃষ্টিকোণ থেকে ভাগ করা যায়।

গত ২২ জানুয়ারি ছিল আমাদের ৩০তম বিবাহবার্ষিকী। এই দিনটিকে স্মরণীয় করে রাখার জন্য আমরা দুজন মিলে বিলেতের ফক্সটনের সাগর পারে একটি সুন্দর নিরিবিলি এলাকায় অবসর যাপন করি। তিনদিন ব্যাপী এই অবসর যাপনে আমরা আমাদের পুরোনো স্মৃতিগুলোকে রোমন্থন করতে থাকি। এই দিনেই আমরা একই ছাদের নিচে জড়ো হয়েছিলাম একটি আত্মিক বন্ধনে। আমাদের এই দিনটিকে স্মরণীয় করে রাখার জন্য আমাদের প্রিয়জনদের আয়োজনের কোনো অন্ত ছিল না। আমাদের দুজনের অজান্তেই তারা অনেক পরিশ্রম করেছেন। আনন্দ-উল্লাস করে আমাদের দুজনকে মাতিয়ে রেখেছেন। সারাদিন ছিল কেমন যেন অন্যরকম ভালোলাগার এবং ভালোবাসার। এই আনন্দের সঙ্গে আরো আনন্দ যোগ হয়েছে। বিশেষ করে আমার একজন কলিগ হাসিনা হঠাৎ এক বক্সভর্তি উপহার দিয়ে আমাদেরকে আনন্দিত করেছেন। এই উপহারও ছিল আমাদের জন্য ভালোবাসার স্মারক। এছাড়া প্রিয় বন্ধু বিশিষ্ট ছড়াকার ও নাট্যকার আবু তাহের এবং তার সহধর্মিণী মিতা তাহেরের আয়োজন ভুলার মতো নয়। সত্যিই অতুলনীয় আবেগ এবং ভালোবাসা-মায়ায় ভরপুর ছিল সেই আয়োজন। নিজের পছন্দসই গিফট, মজাদার সুস্বাদু খাবার আর মধুর আড্ডা সব মিলিয়ে খুব আনন্দময় একটি উইকেন্ড কেটেছিল আমাদের সাথে। আমার প্রিয় গলদা চিংড়ি ভুনা, যশোরের চুইঝাল দিয়ে গরু মাংস ভোনা খুবই স্বাদের ছিল। চুইঝালের সাথে অনেকের পরিচয় নয়। আমিও এবার প্রথম গত সাত জানুয়ারি যশোর গিয়ে মিতা তাহেরের বাড়িতে চুইঝাল খেলাম। খুব মূল্যবান একটি বৃক্ষ। দেশের দক্ষিণাঞ্চলে খুলনা, যশোর, বাগেরহাট, সাতক্ষীরায় চুইঝাল বেশ জনপ্রিয়। দেশের সিংহভাগ চুইঝাল সেখানেই আবাদ হয়। এসব এলাকাতে চুইঝালের কাণ্ড, শিকড় পাতার বোঁটা রান্নার সাথে ব্যঞ্জন হিসেবে এবং ঔষধি পথ্য হিসেবে কাজে লাগায়। বিশেষ করে মাংস; তাও আবার খাসির মাংসে বেশি আয়েশ করে রান্না হয়। মাছের সাথে, ডালের সাথে মিশিয়েও চুইঝাল রান্না করা হয়। আমাদের দেশে ফল খাওয়া হয় না। কিন্তু দক্ষিণ এশিয়ার কোনো কোনো দেশে চুইঝালের ফলকে মশলা হিসেবে ব্যাপকভাবে ব্যবহার করা হয়। আবার এ চুইঝালকে শুকালে লংয়ের মতো মনে হয়। সত্যিই একটি আনন্দঘন সময় ছিল আমাদের জন্য।

এবার আসল বিষয়ে ফেরা যাক।
আজ থেকে ত্রিশ বছর আগে অচেনাভাবে আমরা যাত্রা শুরু করেছিলাম আমাদের দাম্পত্যজীবন। কিন্তু এখন দুজন মিলে গড়ে তুলেছি একটি সুন্দর জীবন, একটি সুখী পরিবার। আমাদের জীবনের সকল আশা-ভরসা এখন একে অন্যকে ঘিরে। আজ একে অন্যকে ছাড়া জীবনের পথচলা অসম্ভব। সারাজীবন এভাবেই আমরা একে অন্যের হাতটা ধরে থাকতে চাই। আমার জীবনে হয়তো অনেক না-পাওয়া আছে, কিন্তু তা সত্ত্বেও আমি অনেক খুশি। আমার জীবনে সুখী হওয়ার সবচেয়ে বড় কারণ হচ্ছে আমার প্রিয়তমা স্ত্রী। তার মতো জীবনসাথি পেয়ে আমার জীবনের সকল চাওয়া পূর্ণ হয়েছে।

১৯৯২ থেকে ২০২২। দেখতে দেখতে কিভাবে যে আমাদের দুজনার যুগল ও দাম্পত্য জীবনের ৩০টি বছর পার গেলো টেরই পেলাম না। মনে হয় এই মাত্র কয় দিন আগে তাকে নববঁধূ হিসেবে বরণ করি। আপন নীড়ে শুরু হয় আমাদের সুখের সংসার। অজানা, অপরিচিত থেকেও আমাদের দুজন মিলে মায়া-প্রীতির বন্ধনে শুরু হলো দাম্পত্য জীবন। একে অপরকে যেন আপন করে নিয়েছিলাম খুব অল্প সময়ে। আর আমার পরিবারে প্রথম পুত্রবঁধূকে স্বাদর সম্ভাষণের জন্য মা-বাবার আনন্দের সীমা ছিলোনা। ভাই-বোন, দেশ-বিদেশের বন্ধুমহল, আত্মীয়-স্বজনের কত পরিকল্পনা ছিল আমাদের বিয়ে নিয়ে। বিশেষ করে বাল্য বন্ধু মোমিন, মুহিব, টিপু, বাবর, রুহেল, সেলিম, দিলু, রনি, তাহের, নজির, এহিয়া গং, আমার আপা-দুলাভাই যেভাবে অক্লান্ত পরিশ্রম ও কষ্ট করেছেন, তা আমার আজীবন মনে থাকবে। বন্ধুবর কবি ও এডভোকেট দিলু অনেক কষ্ট করে লন্ডন ও সিলেটের অনেক জনপ্রিয় কবি সাহিত্যিকদের লেখা দিয়ে একটি বিয়ে স্মরণিকা প্রকাশ করেছিল। আর তা ছিল আমার জীবনে একটি উপহার।
আরো মজার বিষয় কথা হচ্ছে সে সময় সিলেটে ফ্রেশ ফুলের খুব অভাব ছিল। সিলেট সরকারি মহিলা কলেজের সামনে একটি ভ্রাম্যমান ফুলের স্টল ছাড়া আর কোনো ফুলের দোকান ছিল না। তবে  আখালিয়া বিডিআর ক্যাম্পে সাধারণত কিছু ফুল পাওয়া যেত। তখন আমি আর মোামিন রাজধানী ঢাকা থেকে অর্ডার করে ফ্রেশ ফুলের ব্যবস্থা করি। বিয়ের অন্যান্য আনুষ্ঠানিকতা ও শুধু সাদা রঙের গাড়ির বহরসহ সব বয়সের মেহমানদের সুষ্টু ব্যবস্থাপনায় যার অবদান সবচেয়ে বেশি সেই মোমিনকে ধন্যবাদ জানাচ্ছি একটি সুন্দর পরিকল্পনার জন্য। সময়ের ব্যবধানে তা এখন স্মৃতির ডোরে বেঁধে রেখেছি। ৩০ বছরের এই দাম্পত্যজীবনে অনেক পরিবর্তন হয়েছে। জীবনখাতায় অনেককিছুর যোগ-বিয়োগ হয়েছে। জমা হয়েছে অনেক কষ্টকর স্মৃতি। এর মাঝে হারিয়েছি আমার শ্রদ্বেয় তিনজন প্রিয় মানুষকে।  তারা হলেন আমার প্রিয় মা, বাবা ও নানি। আল্লাহ তায়া’লা তাদেরকে রহম করুন।

পরম করুণাময় মেহেরবানী করে তাদের বিনিময়ে আমাদের সংসারে দান করেছেন একটি পুত্র ও দুইটি কন্যা সন্তান, একজন বৌমা ও ফুটফুটে একটি নাতিন। রেফা, রাফি, রিয়া, লিলি ও লিয়ানা এই পাঁচ জন মিলে আমাদের সুখের সংসার। আরো নতুনভাবে যোগ হয়েছে মেয়ের জামাই মিজান, বৌমা লিলি ও নাতিন লিয়ানা। আমাদের ভাই-বোন রুহি ও জাহেদ, অন্য দিকে কচি, হ্যাপী, পপি ও সাবুর মতো কমেডিয়ান শালা-শালী পেয়ে আমরা দুজনই এখন মহাখুশি। তারপরে আমাদের ক্লাবে যোগ দিলেন ভাইরা ভাই মাসুম, আরিফ, আনু এবং একমাত্র সমন্ধির সাথে যোগ দিলেন তার সহধর্মির্ণী রানু ভাবি। শ্যালক সাবুর স্ত্রী জুবিনা, আরো এলেন ভগ্নিপতি সুমন ও ছোট ভাই জাহেদের স্ত্রী শিমুল, ভাতিজা-ভাগ্না-ভাগ্নি, নাতি-নাতিনসহ আরো অনেকে।
উভয় পরিবারের সদস্যদের নিয়ে আমরা খুব ভালো ও সুখেই আছি। ইতোমধ্যে আরো দুইজন শ্রদ্ধেয় ব্যক্তি আমার শ্বশুর ও শাশুড়িকে হারিয়েছি। তাদের কথা ভাবলে অন্তরটা ব্যথাতুর হয়ে যায়। নিজের পিতা-মাতা চলে যাওয়ার পর তাদের কাছ থেকেই পিতামাতার মতো ভালোবাসা পেয়েছি। তাঁদের কাছ থেকেই পেয়েছিলাম অভিভাবকের ছায়া। এছাড়া হারিয়েছি আমার অভিবাবক সমতুল্য একমাত্র ভগ্নীপতি। তাদের সকলের প্রতি আমাদের ভালোবাসা ও দোয়া। আল্লাহর কাছে তাদের রুহের মাগফিরাত কামনা করছি।

আমার প্রিয়তমা সাথি, সুখে-দুঃখে তাকে পেয়েছিলাম সবসময়। তার প্রতি ভালোবাসার নিদর্শনস্বরূপ লিখে নিলাম কয়েকটি লাইন-
তোমার কথা ভাবলে
মনে কষ্ট পাই
না ভাবলেও তাই
সুখে-দুঃখে সবখানে
তোমায় খুঁজে পাই.
দুটো মন এক হয়ে
হাতে হাত রাখো
আজীবন ভালোবেসে
সুখী হয়ে থাকো
হৃদয়ে হৃদয় মিশে
অনাবিল স্বপ্নকে ঘিরে
স্বপ্ন মধুদিন আসে
যেন জীবনে বারে বারে ফিরে।

প্রিয়তমা সাথি! চিরদিন ছায়ার মতো ভালোবাসে থাকো, ভালোবেসে রাখো। জীবনের এই বেলায় এই কামনা আমার।