সিলেটের রায়হান হত্যা : যেভাবে মারা গেলেন মামলার অন্যতম সাক্ষী

বামে নিহত রায়হান ও ডানে সাক্ষী ছোলাই লাল

ডেস্ক রিপোর্ট : সিলেটের আলোচিত রায়হান হত্যা মামলার অন্যতম সাক্ষী ছিলেন সিলেট নগরীর কাষ্টঘরের ছোলাই লাল (৩৭) আত্মহত্যা করেছেন বলে জানিয়েছে পুলিশ। গত বুধবার (১ ডিসেম্বর) তিনি নিজের ঘরে গলায় ফাঁস দিয়ে আত্মহত্যা করেন।

বিষয়টি রোববার (৫ ডিসেম্বর) নিশ্চিত করেছেন সিলেট কোতোয়ালি মডেল থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা মুহাম্মদ আলী মাহমুদ।

তিনি জানান, গত ১ ডিসেম্বর সকাল ১১টার দিকে ছোলাই লালের দেহ গলায় ফাঁস দেওয়া অবস্থায় ঝুলছে দেখতে পান তার পরিবারের সদস্যরা। এসময় তাকে উদ্ধার করে সিলেট এমএজি ওসমানী মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে নিয়ে গেলে কর্তব্যরত ডাক্তার ছোলাই লালকে মৃত ঘোষণা করেন।

ওসি মুহাম্মদ আলী মাহমুদ আরও জানান, ময়নাতদন্ত শেষে মরদেহ পরিবারের কাছে হস্তান্তর করা হয়।

রায়হান হত্যা মামলার ১২ নম্বর সাক্ষি ছিলেন ছোলাই লাল। গত ১০ অক্টোবর দিবাগত রাতে তার ঘর থেকেই পুলিশ রায়হানকে ধরে নিয়ে আসে।

ছোলাই লালের বোন প্রতিমা বলেন, ছোলাই বেশিরভাগ সময় নিজের ঘরে দরজা লাগিয়ে বসে মদ পান করতেন। ১ ডিসেম্বর সকালে অনেক্ষণ দরজায় ডাকাডাকি করে ছোলাই লালের সাড়া না পেয়ে দরজা ভেঙে তার মরদেহ ঘরের ফ্যানের সঙ্গে ঝুলতে দেখতে পান। পরে দেহটি নামিয়ে ওসমানী হাসপাতালে নিয়ে গেলে ডাক্তার মৃত ঘোষণা করেন।

অতিরিক্ত মদ পান করে হিতাহিত জ্ঞান হারিয়ে ছোলাই লা এমন কাণ্ড ঘটাতে পারেন বলে মনে করেন প্রতিমা।

এদিকে, ছোলাই লালে মৃত্যুর খবরটি গণমাধ্যমকে প্রথম জানান সিলেট মহানগর পুলিশের (এসএমপি) বন্দরবাজার ফাঁড়িতে হেফাজতে মৃত্যু হওয়া রায়হান আহমদের মা সালমা বেগম।

রোববার (৫ ডিসেম্বর) রায়হান হত্যা মামলার শুনানিতে আদালতে উপস্থিত হলে সেখানে অপেক্ষামান সাংবাদিকদের কাছে তিনি এ তথ্য প্রদান করেন।

এসময় সালমা বেগম বলেন, ‘রায়হানকে কাষ্টঘরের চুলাই লালের ঘর থেকে সুস্থভাবে ধরে আনে পুলিশ। তাকে মারধর করে রায়হানকে ধরে আনা হয়। চুলাই লাল হলো প্রথম সাক্ষী। সে নাকি মারা গেছে। এখন আমি শুনছি, কেউ কেউ বলছে, পুলিশও বলছে, সে নাকি আত্মহত্যা করেছে। আমি সঠিক জানি না- সে আত্মহত্যা করেছে কি-না বা সে কীভাবে মারা গেছে।’

উল্লেখ্য, গত বছরের ১০ অক্টোবর দিবাগত গভীর রাতে সিলেট শহরের আখালিয়ার এলাকার বাসিন্দা রায়হান আহমদকে বন্দরবাজার পুলিশ ফাঁড়িতে নিয়ে নির্যাতন করা হয়। পরে সকালে তাকে সিলেট ওসমানী মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে ভর্তি করা হলে তিনি সেখানে মারা যান। পরদিন তার স্ত্রী তাহমিনা আক্তার তান্নী কোতোয়ালি থানায় হত্যা মামলা দায়ের করেন।

মামলাটির তদন্তে প্রথমে পুলিশ ছিল। পরে সে বছরের ১৩ অক্টোবর মামলাটি স্থানান্তর করা হয় পুলিশ ব্যুরো অব ইনভেস্টিগেশনের (পিবিআই) কাছে। চলতি বছরের ৫ মে মামলার তদন্ত কর্মকর্তা পিবিআইয়ের পরিদর্শক আওলাদ হোসেন আদালতে চার্জশিট দাখিল করেন। ১ হাজার ৯০০ পৃষ্ঠার প্রতিবেদন দাখিল করা হয়।

যে ছয়জনের বিরুদ্ধে চার্জশিট দেওয়া হয়, তাদের পাঁচজনই পুলিশ সদস্য। তারা হলেন- বন্দরবাজার পুলিশ ফাঁড়ির তৎকালীন ইনচার্জ এসআই আকবর হোসেন ভুঁইয়া, এসআই হাসান উদ্দিন, এএসআই আশেক এলাহী, কনস্টেবল টিটুচন্দ্র দাস ও হারুনুর রশিদ।

অভিযুক্ত অপরজন আব্দুল্লাহ আল নোমান, যার বাড়ি কোম্পানীগঞ্জে। তার বিরুদ্ধে ঘটনার পর ভিডিও ফুটেজ গায়েব করার অভিযোগ রয়েছে।

অভিযুক্ত পাঁচ পুলিশ সদস্য কারাগারে থাকলেও নোমান এখনও পলাতক রয়েছেন। ধারণা করা হচ্ছে, তিনি ভারতে পালিয়ে গেছেন।

গত ৩০ সেপ্টেম্বর সিলেটের অতিরিক্ত মুখ্য মহানগর আদালতের বিচারক আবুল মোমেন রায়হান হত্যা মামলার চার্জশিট গ্রহণ করেন। বাদীপক্ষ চার্জশিটের বিপক্ষে নারাজি দেয়নি। আদালত পলাতক নোমানের বিরুদ্ধে পরোয়ানাও জারি করেন।

এদিকে, পুলিশ হেফাজতে রায়হানের মৃত্যুর ঘটনায় ময়নাতদন্ত রিপোর্টে তার শরীরে ১১১টি আঘাতের চিহ্ন থাকার কথা উল্লেখ করা হয়।

রায়হান হত্যা ঘটনার পর পালিয়ে যান এসআই আকবর। পরে গেল বছরের ৯ নভেম্বর দুপুরে সিলেটের কানাইঘাট উপজেলার লক্ষীপ্রসাদ ইউনিয়নের ডোনা সীমান্ত এলাকা থেকে এসআই আকবর হোসেন ভূঁইয়া গ্রেফতার করে পুলিশ। পরদিন, ১০ নভেম্বর তাকে আদালতে হাজির করে সাত দিনের রিমান্ডে নিয়ে জিজ্ঞাসাবাদের অনুমতি চান তদন্ত কর্মকর্তা; আদালত সাত দিনের আবেদনই মঞ্জুর করেন। রিমান্ড শেষে ১৭ নভেম্বর তাকে আদালতে হাজির করা হয়। আদালত আকবরকে কারাগারে প্রেরণের আদেশ দেন।

এদিকে, রায়হান আহমদ হত্যা মামলার অন্যতম পলাতক আসামি আব্দুল্লাহ আল নোমানের মালামাল ক্রোকের বিষয়ে পরোয়ানার শুনানির দিন ধার্য ছিলো রবিবার (৫ ডিসেম্বর)। ওইদিন সিলেট অতিরিক্ত চিফ মেট্রোপলিটন আদালতে জারিকৃত ক্রোকী পরোয়ানা তামিল হয়ে না আসায় পরবর্তী শুনানির দিন ধার্য করেন আদালত।

বিষয়টি নিশ্চিত করেন নিহত রায়হানের আইনজীবী ব্যরিস্টার এমএ ফজল চৌধুরী। তিনি  বলেন, রায়হান হত্যা মামলার অন্যতম আসামি কোম্পানীগঞ্জের আব্দুল্লাহ আল নোমান। ঘটনার পর সে দেশ ছেড়ে পালিয়ে যায়। পলাতক হওয়ায় তার বিরুদ্ধে গ্রেফতারি ও মালামাল ক্রোকী পরোয়ানা জারি করেন আদালত। রবিবার আদালতে ক্রোকী পরোয়ানা তামিল হয়ে ফেরৎ না আসায় আদালত পরবর্তী তারিখ নির্ধারণ করেছেন।

সংবাদ সূত্রে : সিলেটভিউ