ত্রাণপণ্যের আকাশছোঁয়া দাম, সিলেটে ‘সুযোগে অসৎ ব্যবহার’


ডেস্ক রিপোর্ট : বন্যায় বিপর্যস্ত পুরো সিলেট জেলা। এ পরিস্থিতিতে বন্যার ত্রাণ হিসেবে বেশি ব্যবহৃত খাদ্যপণ্যের দাম গত চার-পাঁচ দিনে আকাশছোঁয়া হয়েছে সিলেটে। শুকনা খাবার হিসেবে ব্যবহৃত চিড়ার দাম কেজিতে কমপক্ষে ৩০ টাকা বেড়েছে। মুড়ির দাম হয়েছে প্রায় দ্বিগুণ। রান্না করা খাবার হিসেবে সবচেয়ে বেশি বিতরণ হয় খিচুড়ি। সেই খিচুড়ির উপকরণ চাল, ডাল, আলুর দামও বেড়েছে এ কয় দিনে। বেড়েছে পেঁয়াজ, ডিমের দামও। রান্নার জ্বালানি হিসেবে ব্যবহৃত কাঠের দামও স্বাভাবিক সময়ের তুলনায় হয়েছে প্রায় দ্বিগুণ। আজ মঙ্গলবার সিলেট নগরের বিভিন্ন এলাকা ঘুরে এমন চিত্র পাওয়া গেছে।

নগরের আম্বরখানা, মদিনা মার্কেট, মেজরটিলা, ইলেকট্রিক সাপ্লাই, উপশহর, শিবগঞ্জসহ বিভিন্ন এলাকার নিত্যপণ্যের দোকান ঘুরে দেখা গেছে, শুকনা খাবারের মধ্যে চিড়া ৮০ থেকে ৯০ টাকা কেজিতে বিক্রি হচ্ছে। ছয় দিন আগেও এই চিড়া বিক্রি হয়েছে ৫৫ থেকে ৬০ টাকা কেজিতে। তবে মুড়ির দাম তিন দিনের ব্যবধানে হয়েছে দ্বিগুণ। গত শুক্রবার মুড়ি যেখানে ৫৩ থেকে ৫৫ টাকায় কেনা গেছে সেখানে এখন ১১০ টাকা কেজিতেও মিলছে না। চিনির দাম কেজিপ্রতি দুই টাকা থেকে পাঁচ টাকা বেড়ে ৮২ থেকে ৮৫ টাকা দরে বিক্রি হচ্ছে।

বন্যাকবলিত হওয়ায় শুকনা জায়গার অভাবে আক্রান্ত এলাকার অনেকে রান্না করতে পারছে না। তাদের কথা চিন্তা করে বিভিন্ন উপজেলায় ও নগর এলাকায় বিভিন্ন সামাজিক, রাজনৈতিক ও স্বেচ্ছাসেবী সংগঠনের পক্ষ থেকে রান্না করা খিচুড়ি বিতরণ করা হচ্ছে। 

কিন্তু গত চার-পাঁচ দিনে খিচুড়ির উপকরণগুলোর দামও ঊর্ধ্বমুখী। বাজারে চালের দাম বেড়েছে। মিনিকেট, জিরা সিদ্ধ থেকে শুরু করে সব জাতের চালের বস্তায় ১০০ টাকা বেড়েছে। এতে খুচরা চালে প্রতি কেজিতে দুই টাকা করে বেড়েছে। চালের দাম সে অর্থে ততটা বাড়েনি যতটা বেড়েছে ডালের দাম। কেজিপ্রতি ডাল যেখানে আগে ১০০ থেকে ১০৫ টাকায় বিক্রি হয়েছে সেখানে এখন কেজিপ্রতি ডাল কিনতে গুনতে হচ্ছে ১১০ থেকে ১২০ টাকা। আলুর দাম কেজিতে পাঁচ টাকা বেড়ে ২৫ টাকা থেকে এক সপ্তাহেরও কম সময়ের ব্যবধানে এখন ৩০ টাকা। কেজিতে একই পরিমাণ দাম বেড়েছে পেঁয়াজের। ৩৫ টাকা কেজির পেঁয়াজ এখন ৪০ টাকায় ঠেকেছে। ডিমের দামেও অদ্ভুত কারসাজি দেখা গেছে। ফার্মের মুরগির ডিমের দাম যেখানে হালিপ্রতি ৩৮ থেকে ৪২ টাকা ছিল এখন সেটা ৪৫ থেকে ৪৮ টাকায় উঠেছে।

খিচুড়ি রান্নার জন্য জ্বালানি কাঠেরও চাহিদা বেড়েছে। সঙ্গে প্রতিদিনই বাড়ছে এর দাম। যেখানে সাধারণত প্রতি মণ জ্বালানির কাঠ (চারকল) ৪০০ থেকে ৫০০ টাকায় বিক্রি হতো, গতকাল পর্যন্ত তার দাম ৯৫০ টাকায় গিয়ে পৌঁছেছে।

নগরের দরগা গেট এলাকার সালাউদ্দিন স্টোরের স্বত্বাধিকারী সালাউদ্দিন আহমদ বলেন, ‘কয়েকটি পণ্যের দাম হুট করে বেড়েছে। চিড়া এখনো ৮০ টাকা কেজিতে বিক্রি করছি। কিন্তু স্টক শেষ হলে নতুন করে আনলে আরো বেশি দামে বিক্রি করতে হবে। কারণ পাইকারি বাজারে আরো দাম বেড়েছে। একইভাবে মুড়ি ৯০ টাকায়, ডাল ১২০ টাকায়, আলু ৩০ টাকায় বিক্রি করতে হচ্ছে।’ 

দাম বাড়ার কারণ সম্পর্কে তিনি বলেন, ‘বেশি দামে আমরা তো বিক্রি করতে চাই না। কিন্তু পাইকাররা দাম বাড়ালে আমাদের কিছু করার থাকে না।’

সিলেটের কোম্পানীগঞ্জ উপজেলার বন্যার্তদের জন্য অনেকে বাজার করতে আসেন নগরের আম্বরখানা বাজার এলাকায়। সেখানকার ইসমাইল স্টোরের স্বত্বাধিকারী ইসমাইল ব্যাপারী বলেন, ‘দাম বেড়েছে বেশ কয়েকটি পণ্যের। এর মধ্যে চাল, ডাল, আলু, চিড়া, মুড়ি অন্যতম।’ 

বন্যাকবলিত এলাকা থেকে কিংবা বন্যার্তদের জন্য কেউ কিনতে এলে তিনি অল্প লাভ রেখে পণ্য বিক্রি করে দেন জানিয়ে ইসমাইল বলেন, ‘চিড়া পাইকারি কেনা এবং যাতায়াত ভাড়াসহ আমার কেজিতে ৭৫ টাকা খরচ হচ্ছে এখন। বন্যাকবলিত এলাকা থেকে কেউ এলে আমি অল্প লাভ ধরে বিক্রি করে দিচ্ছি।’

সিলেটের বন্যাকবলিত এলাকায় শুরু থেকে ত্রাণকার্য যৌথভাবে পরিচালনা করে আসছে জানালা ও সিলেট বাইকিং কমিউনিটি। এ কার্যক্রমের সংগঠক ইফতি সিদ্দিকী  বলেন, ‘বিভিন্ন মানুষ আমাদের ফান্ড দিচ্ছেন। কিন্তু পণ্য কিনতে গিয়ে স্বেচ্ছাসেবীরা হিমশিম খাচ্ছেন। কারণ প্রতিদিন পণ্যের দাম বাড়ছে। চিড়া, মুড়ি, চাল, ডাল, ডিম, আলু সব কিছুর দাম বাড়ছে। রান্নার জ্বালানি কাঠের দাম প্রতিদিন বাড়ে। ছয় টাকার মোমবাতি ১২ টাকায় কিনতে হচ্ছে। প্যাকেট করার জন্য প্রয়োজনীয় পলিথিনের দামটাও বেড়েছে।’

গত শুক্রবার থেকে সিলেটের বিভিন্ন এলাকায় বন্যার্তদের মধ্যে খিচুড়ি বিতরণ করছে বাংলাদেশ সমাজতান্ত্রিক দল (বাসদ)। সিলেট জেলা বাসদের সমন্বয়ক আবু জাফর ক্ষোভ প্রকাশ করে বলেন, ‘মানুষের এই দুর্যোগের সময় বন্যার্ত মানুষের ত্রাণ হিসেবে বেশি ব্যবহৃত পণ্যের দাম যেভাবে প্রতিদিন বাড়ছে তা অমানবিক।’ উদাহরণ দিয়ে তিনি বলেন, ‘গত চার দিনে আমরা পাঁচ হাজার মানুষের মধ্যে রান্না করা খিচুরি বিতরণ করেছি। সে অভিজ্ঞতা থেকে বললে রান্না করার কাঠ যেখানে প্রতি মণ আগে ৪০০ থেকে ৫০০ টাকায় পাওয়া যেত সেখানে গত রবিবার প্রতি মণ কিনেছি ৭৫০ টাকায়। পরদিন সোমবার একই পরিমাণ কাঠ কিনতে হয়েছে ৯৫০ টাকায়। মানে এক দিনে বেড়েছে ২০০ টাকা।’ 

শুকনো পণ্যের দামও বাড়ানো হয়েছে জানিয়ে তিনি বলেন, ‘গত ১৭ তারিখ আমরা ৫৩ টাকা কেজিতে মুড়ি কিনেছি বন্যা উপদ্রত এলাকায় বিতরণের জন্য। গতকাল সোমবার সেই মুড়ি ১১০ টাকায় মিলেনি। পরে আমরা মুড়ির বদলে চিড়া কিনে বিতরণ করেছি।’

অস্বাভাবিক দাম বৃদ্ধির বিষয়ে জানতে চাইলে সিলেটের ঐতিহ্যবাহী পাইকারি বাজার কালিঘাট কাঁচামাল আড়তদার সমিতির সাধারণ সম্পাদক হাজি খালেদ হোসেন বলেন, ‘হঠাৎ করে এসব পণ্যের চাহিদা অস্বাভাবিকভাবে বেড়ে যাওয়ায় এটা হয়েছে। তা ছাড়া বিভিন্ন জায়গায় মিল ডুবে যাওয়ায় চাল পেতে কষ্ট হচ্ছে। কোল্ড স্টোরেজ থেকে আলু আনতে এক দিন আগে অর্ডার নিশ্চিত করতে হয়। সব মিলিয়ে কিছু পণ্যের দাম বেড়েছে।’ 

এমন বিপর্যয়ের সময় দাম বৃদ্ধির অমানবিক কি না এমন প্রশ্নে তিনি বলেন, ‘পরিস্থিতির সুযোগ নিয়ে দাম বাড়ালে সেটা অবশ্যই অমানবিক। তবে আমার মনে হয় চাহিদা অস্বাভাবিক বেড়ে যাওয়া, বন্যা পরিস্থিতিতে পণ্যের অপর্যাপ্ততার কারণে এমন হয়েছে। পণ্য সংগ্রহেও বেগ পেতে হচ্ছে। তবে পণ্য এলেই এটি ঠিক হয়ে যাবে।’

সূত্র : কালের কণ্ঠ