কান নিয়েছে চিল : সামিল হোসেন


সামিল হোসেন : বাংলাদেশের 'প্রধান কবি' হিসেবে মর্যাদালাভ করা কবি শামসুর রহমানের ‘পণ্ডশ্রম’ কবিতার একটি লাইনে বলেছিলে ''এই নিয়েছে ঐ নিল যাঃ! কান নিয়েছে চিলে'' কবির এই লাইনের সাথে সাদৃশ্য আজ এবং এই সময়ে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম। বিশেষ করে ফেসবুকে যা যা ঘটে বা ঘটে চলেছে, তার সঙ্গে বেশ প্রাসঙ্গিক চিলের পেছনে খামোখা ছুটা জনগণ। 

উড়ো খবরের পেছনে ছুটে আজ ব্যক্তি, গোষ্ঠী বা সমাজের কোনো অংশের চরম ক্ষতি হয়ে যায়। তখন সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে সামাজিকতার সীমানা ছাড়িয়ে যায়। 

একুশ শতকে এসে ভার্চ্যুয়াল জগৎকে অস্বীকার করা বা এড়িয়ে যাওয়ার কোনো সুযোগ নেই। বর্তমানে ফেসবুকের ব্যবহারকারীই ২৩০ কোটির বেশি। তাই এর প্রভাব এতটাই যে গণমাধ্যম বলি আর সামাজিকতা। ফেসবুক এসবকে নতুনভাবে সংজ্ঞায়িত করেছে। 

এই তো বিগত মার্কিন নির্বাচনে ফেসবুকের মাধ্যমে ভুয়া খবর প্রচারিত হয়েছে, সেই প্রভাব পড়েছে নির্বাচনে। সে জন্য মার্ক জাকারবার্গকে হাজিরা দিতে হয়েছে মার্কিন কংগ্রেসে—এ তো পুরোনো খবর। তার পর থেকে ভুয়া খবর ঠেকাতে ফেসবুকের নানা চেষ্টাও শুরু হয়েছে । 

বাংলাদেশেও ফেসবুক কিংবা অনলাইন ভুয়া খবর ছড়ানোর বড় অস্ত্র। এইতো গতকাল আগুন নিয়ে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে গুজব প্রচারের অভিযোগে সিলেটের বিভিন্ন স্থান থেকে ৪ ভূয়া সাংবাদিকসহ ৭ জনকে গ্রেপ্তার করেছে র‍্যাব-৯। 

গত ২২ জুলাই মধ্যরাতে সিলেটের আকাশে আগুনে শিখা দেখা যায়। যা দেখে ফেসবুকে অনেকেই প্রচার করেন, সিলেট সেনানিবাসের বহুতল ভবনে আগুন লেগেছে। ভয়াবহ এই আগুনে ব্যাপক ক্ষয়ক্ষতি হয়েছে। মিথ্যে এই প্রচারণায় এতে নগরী ও আশপাশের এলাকায় আতংক দেখা দেয়। 

কিন্তু খোঁজ নিয়ে জানা যায়, এটি কোনো অগ্নিকান্ড নয়, সিলেটের লাক্কাতুরা এলাকায় শেভরনের নিয়ন্ত্রাধিন গ্যাসক্ষেত্রে সংস্কার কাজ করা হচ্ছে। তাই গ্যাসকূপের অতিরিক্ত ফায়ার ফ্লো হচ্ছে।

এ ঘটনার তো কাল হলো, তবে প্রতিদিনই এরকম হাজারো গুজব না জেনে না দেখে আমরা অনেকেই ছড়িয়ে দেই। কেননা ভুয়া খবরের নীল সাপেরা ফেসবুকে যেন ফেলেছে নিশ্বাস।

তাই কোনো খবরই যাচাই না করে শেয়ার করা উচিত না, বিশেষ করে অনলাইনে তো নয়ই। প্রযুক্তির এই যুগে প্রযুক্তিগত সুবিধা নিয়ে এর অপব্যবহার করা যায় সহজেই। এখন মূলধারার গণমাধ্যমের লেখাও এদিক–ওদিক করে সেই মাধ্যমের লোগো বসিয়ে ছড়িয়ে দেওয়াই সহজ। এমনকি প্রযুক্তি যে পর্যায়ে তাতে ছবি বা ভিডিও বিকৃত করা, চাঁদের মধ্যে কারও মুখাবয়ব জুড়ে দেওয়া কোনো ব্যাপার না। পরে হয়তো প্রমাণিত হবে, সেটি ভুয়া ছিল। সাইবার আইনে মামলাও হয়তো হবে। তাতে কী, ক্ষতি যা হওয়ার তা হবেই। 

তবে কি এখানে ব্যবহারকারীদের কোন দায়িত্ব নেই? হ্যাঁ নিশ্চয়ই ব্যবহারকারীর দায়িত্ব তো আছেই। কোটি কোটি ব্যবহারকারীর সবাই তো আর প্রযুক্তিতে দক্ষ না, কোনটা ভুয়া কোনটা আসল, তা–ও অনেকে বোঝেন না। ভুয়া খবর, ছবি বা ভিডিওকে বিশ্বাস করেন, শেয়ার করে দেন নিজের ফেসবুক প্রোফাইল বা পেজ থেকে। কিন্তু অনেক দায়িত্বশীল ব্যক্তিকেও দেখা যায় মাঝে মাঝে এমন কিছু পোস্ট দিতে বা শেয়ার করতে, যার কোনো সত্যতা নেই। তাই স্হানীয় কিংবা সারাদেশের যে কোন সংবাদ ফেইসবুক পোস্টে বিশ্বাসী না হয়ে খোঁজ নেই মূলধারার স্হানীয় ও জাতীয় সংবাদপত্র। 

চলুন এবার ফিরে যাই কবি শামসুর রহমানের ‘পণ্ডশ্রম’ কবিতায়, কবির এই কবিতার মূল সারাংশ হল : চিলের পেছনে না ছুটে আগে নিজের কানে হাত দিয়ে দেখতে হবে, সেটা জায়গামতো আছে কি না, তা দেখে তার পর ছুটি।