আজ ভাষা সৈনিক শওকত আলীর ১০৪ তম জন্মবার্ষিকী

১৯৪৮ সালের ১১ মার্চ মহান ভাষা আন্দোলনের শুরুর দিকে বাংলাকে রাষ্ট্রভাষা করার দাবীতে ধর্মঘট চলাকালে পুলিশের লাঠিচার্জে আহত শওকত আলীকে হাসপাতালে নিয়ে যাচ্ছেন বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান।

শওকত আলী কেবল একটি নাম নয়, বাঙালি জাতির সবচেয়ে গৌরবময় ইতিহাসের অন্যতম প্রধান উপাদান। দেশ এবং জাতির প্রয়োজনে একজন মানুষ কতটা নির্লোভ, নিঃস্বার্থ এবং নিবেদিতপ্রাণ হতে পারেন জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান এবং বাংলাদেশের প্রথম প্রধানমন্ত্রী তাজ উদ্দীন আহমদ এরপরে সম্ভবত ৫২’র ভাষা সংগ্রামী শওকত আলী’ই তার সর্বোত্তম দৃষ্টান্ত। বিভিন্ন ইতিহাসের অন্যতম প্রধান নির্মাতা হয়েও বরাবরই নিজেকে আড়াল করে গেছেন ইতিহাস থেকে। 

ইতিহাসে শওকত আলীর নামটি না যতটা উজ্জ্বলভাবে উচ্চারিত হয়েছে, তার ১৫০ মোগলটুলির বাসভবনটি তার চেয়ে বেশি আলোকিত করেছে ইতিহাসকে। মুসলিম লীগের হোসেন শহীদ সোহরাওয়ার্দী এবং আবুল হাশিমের নেতৃত্বাধীন প্রগতিশীল অংশের নেতৃত্বে প্রতিষ্ঠিত পূর্ববঙ্গ আওয়ামী মুসলিম লীগ প্রতিষ্ঠার অন্যতম চিন্তক এবং পরিকল্পক ছিলেন শওকত আলী। 

আওয়ামীলীগের অন্যতম প্রতিষ্ঠাতা, ভাষাসংগ্রামী শওকত আলীকে বর্তমান ইতিহাসবিমুখ রাজনীতিকদের কয়জন চেনে? বর্তমান প্রজন্ম কি চেনে তাকে? জানে এই দেশ এবং জাতির জন্য তার অপরিসীম আত্মত্যাগের সমৃদ্ধ ইতিহাস? বাংলাদেশের প্রথম প্রধানমন্ত্রী তাজউদ্দীন আহমদ এবং বঙ্গবন্ধুর অবর্তমানে নয় মাসের রক্তক্ষয়ী মুক্তিযুদ্ধে নেতুত্ব দেওয়া চার জাতীয় নেতার সম্পর্কেই জানে না বর্তমান প্রজন্মের সিংহভাগ! 

এই দৈন্যতা আসলে কার? সমাজ, রাজনীতি আর প্রজন্মের এই সীমাহীন অবক্ষয় এই প্রজন্মের একজন ক্ষুদ্র রাজনৈতিক কর্মি হিসেবে আমাকে প্রতিনিয়ত পীড়া দেয়। নিজের বিবেক তাড়িত করে হাতে কলম তুলে নিতে, ইতিহাসের নায়কদের সংগ্রামী জীবনগাঁথা তুলে ধরতে। ইতিহাস থেকে বিস্মৃত বহু ইতিহাসের স্রষ্টা শওকত আলী কে নিয়ে আমার এই আর্টিকেলটি বিবেকের তাড়নায়। 

ছাত্রলীগের প্রতিষ্ঠাতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান ১৯৪৭ সালের ১৪ ই আগস্ট পাকিস্তান রাষ্ট্র সৃষ্টির মাসখানেক পর ঢাকা এসে শওকত আলীর ১৫০ মোগলটুলির বাসভবনে বসেই ছাত্রলীগ প্রতিষ্ঠার সকল কর্মকান্ড সম্পাদন করেন। ১৯৪৩ সালে কুষ্টিয়ায় মুসলিম ছাত্রলীগের সম্মেলনে যখন ক্ষমতাসীনদের পদলেহনই হয়ে উঠেছিল নেতৃত্বের একমাত্র যোগ্যতা, একমাত্র মাপকাঠি সেদিনই তরুণ ছাত্রনেতা শেখ মুজিব বিকল্প ছাত্রসংগঠন প্রতিষ্ঠার প্রয়োজনীয়তা উপলব্ধি করেছিলেন। পরবর্তীতে লেখাপড়ার প্রয়োজনে কলকাতা গেলেও সেখানে বসেই নতুন বিরোধী ছাত্রসংগঠন করার ব্যাপারে সিদ্ধান্ত নেন। কলকাতা থেকে মাঝেমাঝে ঢাকা এসে বঙ্গবন্ধু শওকত আলীর ১৫০ মোগলটুলির বাসায় উঠতেন এবং গণতান্ত্রিক যুবলীগ এবং মুসলিম লীগ ওয়ার্কার্স ক্যাম্পের সদস্যদের সাথে এ ব্যাপারে আলোচনায় মিলিত হতেন। 

১৯৪৮ সালের ৪ জানুয়ারি ছাত্রনেতা শেখ মুজিবুর রহমানের নেতৃত্বে ছাত্রলীগ প্রতিষ্ঠিত হয়। বাংলাদেশ রাষ্ট্রের সমর্থক বঙ্গবন্ধু, আওয়ামীলীগ এবং ছাত্রলীগের গোড়াপত্তন শওকত আলীর ১৫০ মোগলটুলির ঐতিহাসিক বাড়ীতে! 

যে আওয়ামীলীগকে জন্ম দিয়েছেন, শৈশবে লালনপালন করেছেন পিতৃ এবং মাতৃস্নেহে- চাইলেই সেই আওয়ামীলীগের অনেক বড় নেতা হতে পারতেন কিন্তু কখনই হননি। অন্যরা যখন নিজেকে জাহির করতে ব্যস্ত, তখন দেশ এবং জাতির জন্য অনেক কিছু করেও নিজেকে সবমসময় আড়াল করেছেন আত্মপ্রচারবিমুখ এই দেশপ্রেমিক রাজনীতিবিদ। 

পিতা ঢাকার গেন্ডারিয়ার বিশিষ্ট ব্যবসায়ী শমসের আলী এবং মাতা মেহেরুননেসা খাতুনের কোল আলো করে ১৯১৮ খ্রিস্টাব্দের ২০ এপ্রিল এই ধরাধামে আবির্ভাব ঘটেছিল শওকত আলীর। মাত্র দু’বছর বয়সে মাতাকে হারান। পুরানো ঢাকার রায়সাহেব বাজারে মামা-মামীর বাড়ীতে শৈশব কাটে তার। মাঝেমাঝে দাদার কাছেও থাকতেন তিনি। ঢাকার ঐতিহ্যবাহী জগন্নাথ কলেজ থেকে গ্রাজুয়েশন সম্পন্ন করে উচ্চশিক্ষার জন্য ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি হন শওকত আলী। তবে রাজনৈতিক সম্পৃক্ততার কারণে সম্পন্ন করতে পারেননি। ১৯৬১ সালে শিক্ষানুরাগী ও নারীনেত্রী নারায়নগঞ্জের সম্ভ্রান্ত পরিবারের মেয়ে রহিমা খাতুনের সাথে বিবাহবন্ধনে আবদ্ধ হন। 

শওকত আলীর বিয়ে ছিল ঢাকাবাসীর জন্য “টক অব দ্যা টাউন”। তিনি যেদিন বিয়ে করতে বরযাত্রী নিয়ে নারায়ণগঞ্জে যান, সেদিন ঢাকা সিটি প্রায় ট্যাক্সী শূন্য হয়ে পড়েছিল। সব ট্যাক্সির গন্তব্য ছিল সেদিন নারায়নগঞ্জ। হোসেন শহীদ সোহরাওয়ার্দী, শেরে বাংলা এ কে ফজলুল হক, মাওলানা ভাসানী, বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান এবং তাজউদ্দীন আহমদ সহ অসংখ্য নেতাকর্মী এবং ঢাকাবাসী বিয়ের বরযাত্রীতে শরিক হয়েছিলেন। পূর্ব পাকিস্তানের সবচেয়ে বড় বোমা ব্যবসায়ী শওকত আলীর ঘনিষ্ঠ বন্ধু ঢাকার চকবাজারের সোলায়মান সাহেব বিশেষ কিছু আতশবাজি বানিয়ে নিয়ে গিয়েছিলেন বিয়েতে। সবকিছু ছাপিয়ে বিয়েতে তিনিই হয়ে উঠেছিলেন প্রধান আকর্ষণ তার আধুনিক এবং দামি আতশবাজি ফুটানোর জন্য। 

শুধু তার বিয়েতেই নয় পারিবারিক প্রায় সকল অনুষ্ঠানেই বঙ্গবন্ধু সহ গুরুত্বপূর্ণ সকল নেতারা আসতেন শওকত আলীর বাড়ীতে। শওকত আলীর দুই পুত্র তাদের সুন্নতে খতনা অনুষ্ঠানে বঙ্গবন্ধুর হাত থেকে খুব সুন্দর চামড়ার স্কুল স্যুটকেস উপহার পেয়েছিলেন বলে স্মৃতিচারণ করতে গিয়ে আবেগাপ্লুত হয়ে পড়েন।

তাদের তিন পুত্র সালাহউদ্দিন আহমেদ আজাদ, মহিউদ্দিন আল আমান শাহেদ, কামালউদ্দিন আহমেদ পিয়াল এবং একমাত্র কন্যা শরমিন শম্পা। 

ব্যতিক্রমী রাজনীতিবিদ এবং ভাষাসংগ্রামী শওকত আলী তিনটি রাষ্ট্রভাষা সংগ্রাম পরিষদেরই সদস্য ছিলেন। আওয়ামীলীগ প্রতিষ্ঠার শুরুতে ঢাকা মহানগর আওয়ামীলীগের মূখ্য সংগঠক ছিলেন। জাতির জনক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান ছিলেন তার ঘনিষ্ঠ বন্ধু। তার ১৫০ মোগলটুলির বাসস্থানটি ছিল ভাষা আন্দোলন এবং বাঙালির স্বাধিকার ও স্বাধীনতা আন্দোলনে নেতৃত্ব দেওয়া সকল নেতৃবৃন্দ এবং কর্মীবাহিনীর মিলনক্ষেত্র। মুসলিম লীগের অন্যায় কাজগুলোর বিরুদ্ধে সোচ্চার হওয়ার লক্ষ্যেই এখানে কর্মী শিবির গড়ে তুলেছিলেন তিনি। কামরুদ্দীন আহমদ, শেখ মুজিবুর রহমান, মোঃ তোয়াহা, অলি আহাদ, তাজউদ্দীন আহমদ, আতাউর রহমান খান, আবদুল আউয়াল, মুহম্মদ আলমাস, শামসুজ্জোহা প্রমুখ কর্মী শিবির কেন্দ্রিক রাজনৈতিক কর্মতৎপরতায়।