ছোটবেলায় সিলেটের ধোপাদিঘী থেকে কচুরিপানা তুলেছেন পররাষ্ট্রমন্ত্রী


ডেস্ক রিপোর্ট : পররাষ্ট্রমন্ত্রী ও সিলেট-১ আসনের এমপি ড. এ কে আবদুল মোমেন বলেছেন, ভারত বাংলাদেশের ব্যাপারে খুবই আন্তরিক। ভারত, মায়ানমার ও থাইল্যান্ড মিলে একটি ‘বিজনেস হাইওয়ে’ করার কাজ শুরু করে। তখন সেই হাইওয়েতে বাংলাদেশকে যুক্ত করতে চিঠি দেয়া হয়েছিল।

ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদী তাতে সম্মত হয়ে বাংলাদেশকেও এই হাইওয়ের সাথে যুক্ত করেছেন। তামাবিল দিয়ে যাতে এই হাইওয়েটি যুক্ত হয় সে প্রস্তাব দেয়া হয়েছে। এতে আমাদের ব্যবসা-বাণিজ্য ও পর্যটন সম্ভাবনা বাড়বে। সিলেটে বিশাল বিমানবন্দর হচ্ছে। তখন প্রতিবেশী রাষ্ট্রের লোকজনও এই বিমানবন্দর ব্যবহার করে তাদের নির্ধারিত গন্তব্যে যেতে পারবেন।

শনিবার (১১ জুন) দুপুরে ভারত সরকারের অর্থায়নে সিলেট নগরীর ধোপাদিঘী সংস্কার ও সৌন্দর্য্যবর্ধন, কাস্টঘরে সুইপার কলোনিতে আবাসিক ভবন এবং চারাদিঘীরপাড়ে স্কুলের বহুতল ভবনের উদ্বোধনী অনুষ্ঠানে বিশেষ অতিথির বক্তৃতায় তিনি এসব কথা বলেন।

ধোপাদিঘীর বর্ণনা দিতে গিয়ে পররাষ্ট্রমন্ত্রী বলেন, ধোপাদিঘী একসময় অনেক বিশাল ছিল। ছোট বেলায় তিনি ও তার ভাইয়েরা এই দিঘী থেকে কচুরিপানা তুলেছেন। ইংলিশ চ্যানেল পাড়ি দেওয়া প্রথম বাঙালি ব্রজেন দাস এই দিঘিতে প্রশিক্ষণ নিয়েছেন। অনেকবার প্রদর্শনীতে এসেছেন। অনেক প্রতিযোগিতা হতো এি দিঘিতে। দিঘিতে প প্রচুর মাছও হতো। এখন ধোপাদিঘি ধ্বংস করে দেয়া হয়েছে। দিঘির অনেকাংশ দখল হয়ে গেছে। তবে আশার কথা হচ্ছে- এখন ওয়াকওয়ে হওয়ায় নতুন করে আর দখল হওয়ার কোনো আশঙ্কা নেই।

সিলেটে একসময় প্রচুর দিঘি ছিল উল্লেখ করে পররাষ্ট্রমন্ত্রী বলেন, একসময় সিলেট শহরে চারাদিঘি, মাছুদিঘি, লালদিঘি ও সাগরদিঘিসহ অনেক দিঘি ছিল। এসব দিঘি ভরাট হয়ে গেছে। শহরে দিঘি থাকা প্রয়োজন। আমেরিকায় মানুষ পানি সংরক্ষণ করে, দিঘির পানি খায়। আমরা ডিপটিউবওয়েল বসিয়ে পানি খাই। এটা নিয়ে আমাদেরকে ভাবতে হবে।

মন্ত্রী বলেন, ধোপাদিঘীর সৌন্দয্যবর্ধনসহ তিন প্রকল্পের যখন চুক্তি হয় তখন ভারতের আসাম ও মেঘালয়ের দুইজন মন্ত্রী ছিলেন যারা ছোটবেলায় এই দিঘিতে সাঁতার কেটেছেন। এখানে স্কুলে পড়েছেন। তারা এই প্রকল্প দেখে অভিভূত হয়েছেন। তৎকালীন ভারতীয় হাইকমিশনার হ্রর্ষবর্ধন শ্রীংলা ও তৎকালীন অর্থমন্ত্রী আবুল মাল আবদুল মুহিতের চেষ্টায় ভারত সরকার এই তিন প্রকল্পে ২৫ কোটি টাকা অর্থায়ন করে।

ধোপাদিঘি আশপাশ এলাকার অতীতের কথা স্মরণ করে ড. মোমেন বলেন, ‘কথিত আছে মোগল স¤্রাট ধোপাদের ব্যবহারের জন্য এই দিঘিটি দিয়েছিলেন। যুদ্ধের সময় ব্রিটিশ সরকার সিলেটে একটি রাস্তা নির্মাণ করতে চায়। তখন আমাদের এক মামা আসামের মন্ত্রী ছিলেন। উনার ছোট ভাই ছিলেন ইঞ্জিনিয়ার। তখন তারা ঠিক করলেন এই ধোপাদিঘিরপাড় হয়ে রাস্তা শিলং পর্যন্ত যাবে। সেই অনুযায়ী সিলেট-শিলং রাস্তা তৈরি হয়।

একসময় ধোপাদিঘী এলাকায় খুব বেশি বাসাবাড়ি ছিল না উল্লেখ করে মন্ত্রী বলেন, ১৯২৯ সালে ধোপাদিঘীরপাড়ে তারা বাড়ি করেন। যেটি এখন হাফিক কমপ্লেক্স নামে পরিচিত।

সিলেট পুরনো কেন্দ্রীয় কারাগারের জায়গা একটি উন্মুক্ত উদ্যান করার প্রত্যাশা ব্যক্ত করে পররাষ্ট্রমন্ত্রী ড. মোমেন বলেন, সাবেক অর্থমন্ত্রী আবুল মাল আবদুল মুহিতের স্বপ্ন ছিল এখান থেকে কারাগার সরিয়ে একটি উদ্যান করার। সেই অনুযায়ী ২০১০ সাল থেকে নতুন কারাগার নির্মাণের কাজ শুরু হয়। এখন পুরনো কারাগারে কেউ থাকেন না। নতুন কারাগারেও অনেক সিট খালি আছে।

পুরনো কারাগারের সাথে অনেক ইতিহাস জড়িয়ে আছে উল্লেখ করে মন্ত্রী বলেন, বাংলাদেশে একজন মাত্র নারীর ফাঁসি হয়েছিল। করিমুন্নেছা নামের ওই নারীর ফাঁসি কার্যকর হয়েছিল এই কারাগারে। এছাড়া বঙ্গবন্ধুকে গ্রেফতারের পর এখানে কারান্তরিণ রাখা হয়েছিল। তাই ঐতিহাসিক এই স্মারকগুলো সংরক্ষণ করে সাবেক অর্থমন্ত্রীর স্বপ্ন বাস্তবায়নে এখানে একটি উন্মুক্ত উদ্যান হওয়া প্রয়োজন।

মন্ত্রী বলেন, এ নিয়ে তিনি প্রধানমন্ত্রীর সাথে কথা বলেছেন। তাকে স্মরণ করিয়ে দিয়েছেন, তিনি সাবেক অর্থমন্ত্রীকে এ প্রকল্প বাস্তবায়নের প্রতিশ্রুতি ও প্রকল্প একনেকে পাশ করিয়েছিলেন। ব্রিটিশ সরকার তৎকালীন ভারতবর্ষের লোকজনকে ভয় দেখানোর জন্য শহরের ভেতরে এভাবে অপরিকল্পিত কারাগার নির্মাণ করেছিল বলেও মন্তব্য করেন মন্ত্রী।

ড. এ কে আব্দুল মোমেন জানান, মৃত্যুর আগে সিলেট সফরে এসেছিলেন সাবেক অর্থমন্ত্রী আবুল মাল আবদুল মুহিত। ওই সময় সিটি করপোরেশনের পক্ষ থেকে তাকে গুণীশ্রেষ্ঠ সম্মাননা দেয়া হয়। ওই সফরকালে সিটি মেয়র আরিফুল হক চৌধুরী সিলেটের কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ উন্নয়নের ব্যাপারে সাবেক অর্থমন্ত্রীর সাথে কথা বলেন। তখন তিনি এ উন্নয়ন প্রকল্পগুলো নিয়ে প্রধানমন্ত্রীর কাছে একটি চিঠি লিখেন। প্রধানমন্ত্রী এই চিঠি পাওয়ামাত্র প্রকল্পগুলোর অনুমোদন দিয়ে দেন। গত মার্চ মাসে লেখা এই চিঠিই ছিল সাবেক অর্থমন্ত্রী মুহিতের লেখা শেষ চিঠি।

সিলেট সিটি কর্পোরেশনের মেয়র আরিফুল হক চৌধুরী সভাপতিত্বে এবং কাশমির রেজা ও ফাতেমা রশিদ সাবা’র উপস্থাপনায় উদ্বোধনী অনুষ্ঠানের শুরুতে কোরআন তেলাওয়াত করেন শেখঘাট সমজিদের ইমাম ও খতিব মাওলানা মো. ছাদিকুর রহমান, গীতা পাঠ করেন শ্রী সুধাময় চক্রবর্তী, বাইবেল পাঠ করেন ফাদার ডিকন নিঝুম সাংমা এবং ত্রিপিটক পাঠ করেন শ্রী সংঘানন্দ থেরো।

অনুষ্ঠানে বিশেষ অতিথির বক্তব্য রাখেন স্থানীয় সরকার বিভাগের সচিব মিসবাহ উদ্দিন চৌধুরী। অনুষ্ঠানের শুরুতেই প্রকল্প সংক্ষেপ তুলে ধরেন সিসিকের প্রধান প্রকৌশলী নূর আজিজুর রহমান।  

অনুষ্ঠানে সিলেট সিটি কর্পোরেশনের কাউন্সিলরদের মধ্যে উপস্থিত ছিলেন- কাউন্সিলর মোহাম্মদ তৌফিক বকস, কাউন্সিলর সালেহ আহমদ সেলিম, কাউন্সিলর মখলিছুর রহমান কামরান, কাউন্সিলর আজম খান, কাউন্সিলর ইলিয়াসুর রহমান, কাউন্সিলর আফতাব হোসেন খান, কাউন্সিলর রাশেদ আহমদ, কাউন্সিলর রকিবুল ইসলাম ঝলক, কাউন্সিলর আব্দুল মোনিম, কাউন্সিলর সিকন্দর আলী, কাউন্সিলর আব্দুল মুহিত জাবেদ. কাউন্সিলর তারেক উদ্দিন তাজ, এসএম শওকত আমীন তৌহিদ প্রমুখ।

উপস্থিত ছিলেন সিলেট মহানগর আওয়ামী লীগের সভাপতি বীর মুক্তিযোদ্ধা মাসুক উদ্দিন আহমদ, সাধারণ সম্পাদক অধ্যাপক জাকির হোসেন, স্থানীয় সরকার বিভাগের যুগ্ম সচিব নূরে আলম সিদ্দীকি, সিসিকের প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা বিধায়ক রায় চৌধুরী, সিলেট বিভাগীয় কমিশনার ড. মোশারফ হোসেন, সিলেট জেলা প্রশাসক মো. মজিবর রহমান, ডিআইজি প্রিজন কামাল হোষেন, সিলেট মহানগর পুলিশের উপ-কমিশনার (উত্তর) আজবাহার আলী শেখ প্রমুখ।
 
উল্লেখ্য, ভারত সরকারের অর্থায়নে ২৪ কোটি ২৮ লক্ষ ৪৫ হাজার টাকা ব্যয়ে নগরীর ধোপাদীঘির তীর সংরক্ষণ, কাষ্টঘরে ৬ তলাবিশিষ্ট ক্লিনার কলোনি ও চারাদীঘিরপাড় মজলিস আমীন স্কুলের ৬ তলাবিশিষ্ট ভবনের নির্মাণ প্রকল্প বাস্তবায়িত হয়েছে।


সৌজন্যে : সিলেট ভিউ